
শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতি আবুল কাসিম নোমানী দা.বা. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
ক্ষনজন্মা যে সকল মহীরুহ-এর আগমন এই পৃথিবীতে ঘটে, তাদের অন্যতম আমাদের শাইখ ও মুর্শিদ, নমুনায়ে আসলাফ, রাহবারে মিল্লাত, বর্তমান বিশ্বের শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতি আবুল কাসিম নোমানী মাদ্দাযিল্লুহূ।
জন্ম : এই মহামনিষী ২২ সফর ১৩৬৬ হি. মোতাবেক ১৪ জানুয়ারী ১৯৪৭ সনে ভারতের উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক শহর বেনারসে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাজী হানিফ সাহেব ও দাদা ছিলেন কারী নিজামুদ্দিন সাহেব রহ.।
শিক্ষার্জন : প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি মমতাময়ী মা ও পরম শ্রদ্ধাভাজন দাদাজানের হাতে। এর কিছুদিন পর জামিয়া ইসলামিয়া মদনাপুরা, বেনারসে তাঁর একাডেমিক পড়াশোনার সূচনা হয়। অতঃপর ১৩৭৯ হিজরিতে উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দারুল উলুম মউনাথ, ভঞ্জনে দরসে নেজামির পাঠ শুরু করেন। এখানে ২ বছর অধ্যয়ন শেষে ১ বছর মিফতাহুল উলুম, মৌতে পড়াশোনা করেন। অতঃপর ১৩৮২ হিজরীতে মাদরে ইলমি দারুল উলুম দেওবন্দে সিউম জামাত (শরহে জামী)-এ ভর্তি হন।
দাওরায়ে হাদীস সমাপন : দারুল উলুম দেওবন্দে ১৩৮৭ হিজরি সনে ১০ বিষয়ে ৫০০ নাম্বারের মধ্যে হতে ৪৮৫ নাম্বার পেয়ে ১ম স্থান অর্জন করে দরসে নেজামির ইতি টানেন। আর সেই বছর দাওরা হাদীসের ছাত্র সংখ্যা ছিল আসহাবে বদরীর সমান তথা; ৩১৩ জন।
ইফতা : দাওরায়ে হাদীস সমাপন না হতেই হযরতওয়ালার জামিয়া ইসলামিয়া বেনারসে খেদমত ঠিক হয়ে যায়। সহপাঠী মাওলানা আব্দুল মতিন মুফতি মাহমুদ হাসান গাংগুহী রহি. এর নিকট চিঠি মারফতে অনুমতিও নিয়ে নেন। কিন্তু হযরতওয়ালার বারংবার অনুরোধের ফলে ফকিহুল মিল্লাত রহি. খেদমতের পরিবর্তে ইফতা বিভাগে ভর্তি হওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর হযরতওয়ালা দারুল উলুমে ইফতা বিভাগে ভর্তি হন ও ১৩৮৮ হিজরি সনে কৃতিত্বের সাথে ইফতা সমাপন করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দে উল্লেখযোগ্য উস্তাদবৃন্দ :
১। আল্লামা সায়্যিদ ফখরুদ্দিন মুরাদাবাদী রহি.
২। আল্লামা ইব্রাহীম বলইয়াবী রহি.
৩। আল্লামা কারি তায়্যিব সাহেব রহি.
৪। আল্লামা আনজার শাহ কাশ্মীরী রহি.
৫। মুফতি মাহমুদ হাসান গাংগুহী রহি.
৬। মুফতি নিজামুদ্দিন আজমী রহি.
৭। আল্লাম ওয়াহিদুজ্জামান কিরানভী রহি.
বাইয়াত ও খেলাফাত : হযরতওয়ালা দা.বা. প্রথমে হযরত শাইখুল হাদীস জাকারিয়া সাহেব রহি. এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং হযরতের ইন্তেকালের পর মুফতি মাহমুদ হাসান গাংগুহী রহি. এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন (যার প্রতি শাইখুল হাদীস রহি. জীবদ্দশাতেই ইঙ্গিত করে গিয়েছিলেন) এবং সুলুকের সর্বোচ্চ মাকাম খেলাফত অর্জন করেন।
কর্মজীবন : ইফতা সমাপনীর পর হযরতওয়ালাকে মুফতি মাহমুদ হাসান গাংগুহী রহি. বলেন, “চাইলে আমার কাছে থেকে যেতে পারো, তোমার জন্য কিছু বেতনও নির্ধারণ করে দেবো।” কিন্তু জামিয়া ইসলামিয়া বেনারসে যোগদানের জন্য ক্রমাগত অনুরোধের ফলে হযরত উক্ত জামিয়ায় কর্মজীবন আরম্ভ করেন। ১৯৬৮ ইং থেকে শুরু করে ২০১০ ইং পর্যন্ত উক্ত মাদ্রাসার শাইখুল হাদীস ও প্রধান মুফতি হিসেবে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসেন এবং ২৩ বছর যাবৎ সহীহ বুখারী ও তিরমিজির দরস প্রদান করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম নির্বাচন : হযরতওয়ালা দা.বা. পূর্ব থেকেই দারুল উলুম দেওবন্দের শুরাসদস্য ছিলেন। ২০১০ সনে মাওলানা মারগুবুর রহমান রহি. এর ইন্তেকালের পর হযরতওয়ালাকে কারগুজার মুহতামিম (ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী মুহতামিম) নির্বাচন করা হয়। ২য় মাজলিসে হযরত মাওলানা গোলাম আহমাদ বাস্তানবী দা. বা. (খলিফা, শাইখুল হাদীস জাকারিয়া রহি. ও মুহতামিম আক্কেলকুয়া মাদ্রাসা, মহারাষ্ট্র) কে মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তবে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের কারণে পূনরায় হযরতওয়ালা দা.বা. কে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারগুজার মুহতামিম নিযুক্ত করা হয়। পরিশেষে জুলাই ২০১১ থেকে স্থায়ী মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। যা অদ্যাবধি চলমান। আল্লাহ তায়ালা হযরতওয়ালা দা. বা. এর হায়াতে বারাকাহ দান করুন। আমীন!
দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস মনোনীত : একদা আমি (মুহাম্মদ ইব্রাহীম নোমানী) হযরতওয়ালা দা.বা. কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুহতামিম হওয়ার পরও আপনার কাছে তিরমিজি শরীফের দরস কিভাবে আসল? কেননা ইতিপূর্বে দারুল উলুমে এমনটা কখোনো ঘটেনি।
হযরতওয়ালা দা.বা. উত্তরে বললেন “আমাকে মজলিসে শূরার পক্ষ থেকে মুহতামিম নিযুক্ত করার সময়ে আমি শর্ত দিয়েছিলাম যে, আমাকে দরস দেওয়া হলেই আমি দায়িত্ব নেবো। নতুবা নিবো না। সেই প্রেক্ষিতে আমাকে তিরমিজি শরীফ দেওয়া হয়েছে।”
১৪৩৫ হি. শিক্ষাবর্ষে (আমাদের দাওরায়ে হাদীসের বছর) শাইখুল হাদীস হযরত সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহি. খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লে তার অসুস্থতাকালীন সময়ে হযরতওয়ালার নিকট ১ম বার সহীহ বুখারীর দরসের সাময়িক জিম্মাদারী আসে। হযরতুল উস্তাদ পালনপুরী রহি. এর ইন্তেকালের পর মজলিসে শুরা হযরতওয়ালা দা.বা. কে শাইখুল হাদীস হিসেবে নির্বাচন করেন। যা দারুল উলুমের জন্য এক বিরল ইতিহাস। হযরতওয়ালা দা.বা. দারুল উলুমের ১০ম মুহতামিম ও ১০ম শাইখুল হাদীস। আলহামদুলিল্লাহ! হযরতওয়ালা অদ্যাবধি বুখারী শরীফ দরস দানের পাশাপাশি ইহতেমামের সকল কাজ সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়ে আসছেন।
তাযকিয়ার খেদমত : হযরতওয়ালা দা.বা. ইজাযাত পাওয়ার পর থেকেই ইসলাহ ও তাযকিয়ার খেদমত করে আসছিলেন। সালেকিনদের সাথে নিজেও প্রতিনিয়ত মামুলাত আদায় করে করে থাকেন, যা অনন্য এক নজির। হযরতওয়ালা দেশ-বিদেশে ইসলাহী বয়ান, মাজলিস কায়েমের পাশাপাশি প্রতি বছর খানকায়ে মাহমুদিয়া বেনারসে রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করে থাকেন। হযরত ইব্রাহিম আফ্রিকী সাহেব দা. বা. এর সাথে দেশ-বিদেশে সিলসিলার বিভিন্ন এতেকাফের মজলিসে অংশ গ্রহণ করে থাকেন।
সফর : তিনি এশাআতে দেওবন্দিয়্যাতের জন্য প্রতিনিয়ত হিন্দুস্তানের আনাচে-কানাচে সফর করার পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বহু জায়গায় আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিচ্ছেন ৭৮ বছরের আল্লাহর এক মুখলিস দায়ী হিসেবে।
তাসনীফাত : হযরতওয়ালা দা. বা. এর বিভিন্ন লিখনি-ফতোয়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মাজাল্লা ও পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। হযরতওয়ালার অন্যতম লিখনিগুলো; আসবাকে হাদীস, মাওয়েজে নোমানী, মাকালাতে নোমানী, খুতুবাতে নোমানী, আত-তাকরীরুল মারজী (তিরমিজির নির্ধারিত অংশের শরাহ)।
এছাড়াও হযরতওয়ালার নিকট সায়্যিদ ফখরুদ্দিন মুরাদাবাদী রহি. এর সহীহ বুখারির পূর্ণ তাকরীর লিপিবদ্ধ রয়েছে। যা তিনি ছাত্র অবস্থাতেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন। আমি একদা হযরতওয়ালাকে তা ছাপানোর বিষয়ে বললে প্রতিউত্তরে হযরতওয়ালা বলেন,
حضرت کی تقریرات مولانا ریاست علی بجنوری نے اشاعت کردیا، مقصد حاصل ہو چکا، دوبارہ اشاعت کی ضرورت نہیں ہے
এটাই হলো এখলাসের নিদর্শন। অথচ উভয়ে ভিন্ন দুই শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদীস পড়েছিলেন।
আল্লাহর রহমতে হযরতওয়ালা দা. বা. আজও দারুল উলুমের ইলমী নুর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর হযরতওয়ালা দা. বা. এর ছায়া আরও সুদীর্ঘ ও স্থায়ী করুন, আমীন!